ছদ্মবেশী ইমাম। কিশোর গোয়েন্দা উপন্যাস। ষষ্ঠ পর্বঃ মৃত্যুর মুখে

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

ছদ্মবেশী ইমাম। কিশোর গোয়েন্দা উপন্যাস

 ল্যাবরেটরির লাল জরুরি আলোটা লাটিমের মতো ঘুরছে। পুরো স্টেশনটি টর্পেডোর আঘাতে কেঁপে উঠল। মাহিনের হাতের পিস্তলটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো, সেই সুযোগে জাওয়াদ ডক্টর মানসুরকে নিয়ে একটি শক্তিশালী স্টিল কলামের আড়ালে ঝাঁপ দিল

"মাহিন! ওরা তোমাকেও বাঁচতে দেবে না!" জাওয়াদ চিৎকার করে বলল। "টর্পেডোটা মোসাদের জাহাজ থেকেই ছোঁড়া হয়েছে। তারা চায় না কোনো সাক্ষী বেঁচে থাকুক।"

মাহিন স্তম্ভিত হয়ে ল্যাবের মনিটরের দিকে তাকাল। রাডারে দেখা যাচ্ছে আরও দুটি টর্পেডো ধেয়ে আসছে। তার চেহারায় ফুটে উঠল চরম হতাশা আর অনুশোচনা। সে বুঝতে পারল, যাদের জন্য সে নিজের দেশ আর আদর্শকে বিক্রি করেছিল, তারা তাকে টিস্যু পেপারের মতো ছুড়ে ফেলেছে

"আমি... আমি কী করলাম!" মাহিন বিড়বিড় করল। তার হাত থেকে পিস্তলটা পড়ে গেল

"অনুশোচনা করার সময় এটা নয়," জাওয়াদ দ্রুত ল্যাবের মূল কম্পিউটারের দিকে এগোল। "ডক্টর, এই ল্যাবরেটরির কি কোনো সেলফ-ডেসট্রাকশন মোড আছে? তথ্যগুলো শত্রুর হাতে পড়ার আগেই আমাদের সব ধ্বংস করে দিতে হবে।"

ডক্টর মানসুর কিবোর্ডে আঙুল চালালেন। "হ্যাঁ, আছে। কিন্তু তার আগে আমাদের ডাটাগুলো একটি নিরাপদ ক্লাউডে আপলোড করতে হবে যাতে উম্মাহর ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীরা তা ব্যবহার করতে পারেন। আর তার জন্য তোমার ওই পেনড্রাইভটি প্রয়োজন।"

জাওয়াদ দ্রুত পেনড্রাইভটি মেইনফ্রেমে গেঁথে দিল। স্ক্রিনে প্রগ্রেস বার উঠতে লাগল— ১০%... ৩০%... ৫০%

ঠিক তখন ল্যাবের প্রবেশপথ ধড়াম করে ভেঙে পড়ল। সেই ছদ্মবেশী 'ইমাম' ওরফে মোসাদ কমান্ডার চারজন সশস্ত্র কমান্ডো নিয়ে ভেতরে ঢুকল। তাদের পরনে ওয়াটারপ্রুফ কমব্যাট গিয়ার

"খুব হয়েছে নাটক!" কমান্ডার কর্কশ গলায় বলল। "সবাইকে শেষ করে দাও!"

গুলির বৃষ্টি শুরু হলো। মাহিন হঠাৎ নিজের পিস্তলটা কুড়িয়ে নিয়ে পাল্টা গুলি শুরু করল। "জাওয়াদ, তুমি কাজ শেষ করো! আমি ওদের থামাচ্ছি। এটা আমার প্রায়শ্চিত্ত!"

মাহিন বীরত্বের সাথে লড়তে লাগল, কিন্তু সে সংখ্যায় অনেক কম। জাওয়াদের ল্যাপটপ স্ক্রিনে তখন ৯৫% আপলোড দেখাচ্ছে। আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড

"ডক্টর, কাউন্টডাউন শুরু করুন!" জাওয়াদ চেঁচিয়ে উঠল

ডক্টর মানসুর কাঁপাকাঁপা হাতে লাল বাটনটি চাপলেন। যান্ত্রিক কণ্ঠে ঘোষণা হলো— "Self-destruction sequence initiated. T-minus 60 seconds."

দ্বিতীয় টর্পেডোটি স্টেশনের গায়ে আঘাত হানল। ল্যাবের কাঁচের দেয়ালে ফাটল ধরতে শুরু করেছে। সমুদ্রের নোনা জল প্রবল বেগে ভেতরে ঢুকছে। জাওয়াদ পেনড্রাইভটি পকেটে পুরে মাহিনকে টেনে তুলল। "চলুন! এখান থেকে বের হওয়ার ইমার্জেন্সি পড আছে!"

কমান্ডার জাওয়াদের দিকে গুলি ছুঁড়ল, কিন্তু পানির তোড়ে সে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেল। জাওয়াদ, ডক্টর মানসুর এবং আহত মাহিন দ্রুত ইমার্জেন্সি পড-এর ভেতরে ঢুকে পড়লেন। ঠিক যখন পডটি স্টেশন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ওপরের দিকে ছুটল, তখনই এক বিশাল বিস্ফোরণে সমুদ্রের তলদেশ প্রকম্পিত হয়ে উঠল

গোপন ল্যাবরেটরি, ষড়যন্ত্রের নীল নকশা আর সেই বিশ্বাসঘাতক কমান্ডারেরা চিরতরে জলের অতলে হারিয়ে গেল

পডটি যখন সমুদ্রের উপরিভাগে ভেসে উঠল, তখন ফজর হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্ত। পুব আকাশে হালকা নীল আভা। জাওয়াদ পডের ছোট জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। তার চোখে জল, কিন্তু মনে প্রশান্তি। সে মনে মনে বলল, "আলহামদুলিল্লাহ।"

সে তার পকেট থেকে পেনড্রাইভটি বের করে দেখল। এটি রক্ষা পেয়েছে। ইনসাফ আর আমানতদারির এই লড়াইয়ে আজ সত্যের জয় হয়েছে

মাহিন ম্লান হেসে বলল, "তুমি শুধু একজন কিশোর নও জাওয়াদ, তুমি উম্মাহর এক অতন্দ্র প্রহরী।"

জাওয়াদ হাসল। তবে সে জানে, এই শেষ নয়। সমুদ্রের ঢেউয়ের আড়ালে হয়তো আরও বড় কোনো রহস্য অপেক্ষা করছে

ভোরের স্নিগ্ধ আলো যখন বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশির ওপর এসে পড়ল, জাওয়াদ তখন পডের ভেতর থেকে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ছিল। রাতভর যে মৃত্যুশীতল লড়াই সে লড়েছে, তার ছাপ তার ক্লান্ত দু'চোখে। কিন্তু তার হৃদয়ে বইছে এক প্রশান্তির হাওয়া।

উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছাতেই দেখা গেল বাংলাদেশের কোস্টগার্ড এবং বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কয়েকটি জাহাজ তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। ডক্টর মানসুর জাওয়াদের কাঁধে হাত রেখে বললেন, "জাওয়াদ, তুমি আজ যা করলে তার ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না। এই প্রযুক্তির রহস্য যদি ভুল হাতে যেত, তবে মানবজাতির জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসত।"

আহত মাহিনকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়া হলো। যাওয়ার আগে সে জাওয়াদের হাত শক্ত করে ধরে কেবল এটুকুই বলল, "ক্ষমা করে দিও ছোট ভাই। অন্ধ মোহে পড়ে আমি প্রায় সব হারিয়েছিলাম। আজ তুমি আমাকে শুধু জীবন দাওনি, আমার ইমান আর বিবেককেও বাঁচিয়েছ।"

সপ্তাহখানেক পর

পুরানো ঢাকার সেই পরিচিত সরু গলি। মাগরিবের আজান শেষ করে জাওয়াদ যখন মসজিদ থেকে বের হচ্ছিল, তখন তার ফোনে একটি এনক্রিপ্টেড মেসেজ এল। প্রেরকের নাম নেই, শুধু একটি চিহ্ন— একটি ঈগল। মেসেজে লেখাঃ "কাজটি চমৎকার হয়েছে, জাওয়াদ। কিন্তু মনে রেখো, অন্ধকার কখনও পুরোপুরি শেষ হয় না। সে কেবল রূপ বদলায়।"

জাওয়াদ মুচকি হাসল। সে জানে, 'ইনসাফ' আর 'আমানতদারি'র এই পথ চলা কখনও শেষ হওয়ার নয়। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, "হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল" (আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট)

ল্যাপটপ ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করে নিয়ে জাওয়াদ ধীরপদে বাড়ির দিকে পা বাড়াল। তার সামনে নতুন দিন, আর হয়তো আরও রোমাঞ্চকর কোনো নতুন রহস্য

সমাপ্ত

[এই উপন্যাসে বর্ণিত সকল চরিত্র, স্থান এবং ঘটনাবলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তবের কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে এর কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। কাহিনীর প্রয়োজনে কিছু গোয়েন্দা কৌশল ও প্রযুক্তির উল্লেখ করা হয়েছে, যা নিছক বিনোদনের উদ্দেশ্যে রচিত। গল্পের অলঙ্করণে ব্যবহৃত ফিচার ইমেজের কোনো চরিত্রের সাথে যদি কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তির চেহারার মিল পাওয়া যায়, তবে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত এবং কাকতালীয়। লেখক কোনো উগ্রতা বা সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেন না; বরং বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই এবং নৈতিক মূল্যবোধকে তুলে ধরাই এই গল্পের মূল লক্ষ্য।]

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default